মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৯:৩৫ অপরাহ্ন

মারা যাওয়া আসামি আদালতে হাজির, বন্দুকযুদ্ধে ‘নিহত’ কে?

সোজা সাপটা রিপোর্ট / ২৩৮ জন পড়েছেন
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

চট্টগ্রামে এক আসামির সঙ্গে নাম মিলে যাওয়ায় জীবন দিতে হয়েছে শিক্ষার্থী জয়নালকে। তবে বন্দুকযুদ্ধে নিহতের খবর গণমাধ্যমে দেখে আদালতে হাজির হয় আসল আসামি।

জানা গেছে, দুই বছর আগে মারধরের অভিযোগে মামলা হয় চট্টগ্রাম আদালতে। এই মামলার অভিযোগপত্র দাখিল হয় গত বছরের ১৫ অক্টোবর। চার্জশিটে বলা হয়, আসামি জয়নাল বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। আবেদন করা হয় অন্য আসামির বিচার শুরুর।

‘‘এজাহারের ২ নম্বর আসামি মো. জয়নাল, পিতা আবদুল জলিল পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। তার নিহত হওয়ার সব বিষয় ও কাগজপত্র মামলার কেস ডকেটে (সিডিতে) নোট রাখি। একাধিকবার চিঠি দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কাছ থেকে মেডিকেল সার্টিফিকেট (এমসি) সংগ্রহ করেছি।’’ মারধর, হত্যাচেষ্টা ও চুরির মামলার আসামি বখাটে মো. জয়নালের মারা যাওয়ার বিষয়টি এভাবে চার্জশিটে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দিপংকর চন্দ্র রায়। নিহত হওয়ায় এই আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে আবেদন করা হয়। পুলিশের তদন্তের আলোকে আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতিও দেন আদালত।

তবে এর কিছুদিন পরই বখাটে জয়নাল হঠাৎ আদালতে এসে আইনজীবীর মাধ্যমে এ মামলায় হাজিরা দাখিল করে। আসামি জয়নাল আবেদন করে জানান, মারা যাননি তিনি। ফলে মামলাটি অন্যদিকে মোড় নেয়। সামনে আসে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একজনের জায়গায় অন্যজন মারা যাওয়ার বিষয়টি।
জানা যায়, পুলিশের ‌‌‘বন্দুকযুদ্ধে’ যে জয়নাল প্রাণ হারিয়েছে, সে আসলে ওই মামলার আসামি নয়। সে দশম শ্রেণির ছাত্র ছিল, পড়ত বায়েজিদে অবস্থিত ভোকেশনাল অ্যান্ড টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটে।

ফলে অভিযোগ উঠেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নাম ভুল করায় নিরপরাধ শিক্ষার্থীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। যদিও শিক্ষার্থী ও আসামির নাম এক হলেও তাদের বাবার নাম ভিন্ন ছিল।

নিহত শিক্ষার্থী জয়নালের মা-বাবা, সহপাঠী, শিক্ষক ও প্রতিবেশীরা জানান, বখাটে আসামি জয়নালের জায়গায় পুলিশ শিক্ষার্থী জয়নালকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মেরে ফেলেছে। চার্জশিটেও উঠে এসেছে সে তথ্য। অনুসন্ধানেও মিলেছে তার সত্যতা। সবাই শিক্ষার্থী জয়নালকে শান্ত ও ভালো ছেলে হিসেবে চিনতেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সবাই বলেছেন, জয়নালের মধ্যে কোনোদিন খারাপ কিছু নজরে আসেনি। এ রকম একজন শিক্ষার্থী নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের মাঠেই গভীর রাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর রাত ১টায় শিক্ষার্থী জয়নাল ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়ার পর পুলিশ মিডিয়াকে বলেছিল- সে মারধরসহ বেশ কয়েকটি মামলার আসামি ছিল। তার বাবার নাম আবদুল জলিল। সে অনুযায়ী তদন্ত শেষ করে এসআই দিপংকর চন্দ্র রায় মামলার আসামি থেকে বখাটে জয়নালের নাম বাদ দিয়ে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। তবে এরপর তিন দফা শুনানিতে আদালতে হাজিরা দেয় আসল আসামি জয়নাল।

‘বন্দুকযুদ্ধে’ প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী মো. জয়নাল নোয়াখালীর মাইজদীর বাসিন্দা নুরুল ইসলামের ছেলে। মামলার আসল আসামি বখাটে মো. জয়নাল চট্টগ্রাম নগরীর রৌফাবাদ পাহাড়িকা আবাসিক এলাকার আবদুল জলিলের ছেলে।

এ ব্যাপারে আসল আসামি জয়নাল জানায়, আরেক জয়নালকে মেরে ফেলার বিষয়টি জানতে পেরে ভয়ে তাড়াতাড়ি ওই মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়ে যাচ্ছে।

এ মামলার নথিতে আসল আসামি মো. জয়নালের নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার আবেদনগুলো সংযুক্ত রয়েছে। বর্তমানে মামলাটি চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে বিচারাধীন।

এ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী চট্টগ্রাম মহানগরের অতিরিক্ত পিপি আবিদ হোসেন বলেন, মামলার ২ নম্বর আসামি আবদুল জলিলের ছেলে মো. জয়নালের বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার তথ্য চার্জশিটে তুলে ধরা হয়েছে। এ সংক্রান্ত কাগজপত্রও সিডিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে এখন দেখছি, মৃত আসামি জয়নাল আদালতে হাজিরা দিচ্ছে। তাহলে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এ মামলার আসামি জয়নাল মারা যায়নি। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বন্দুকযুদ্ধে অন্যজন মারা গেছে।

অ্যাডভোকেট আবিদ আরো বলেন, আগামী ৬ অক্টোবর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন আদালতে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাটি আসলে কী ছিল, তা বের করতে জুডিশিয়াল তদন্তের জন্য আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দিপংকর চন্দ্র রায় বলেন, যখন এ মামলার তদন্তভার নিই, তখন বায়েজিদ থানায় নতুন যোগদান করেছিলাম। ভুল করে বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়া জয়নালকে এ মামলার আসামি জয়নাল ভেবে চার্জশিট থেকে বাদ দিয়েছি।

বন্দুকযুদ্ধে মারা গেল কোন জয়নাল? জবাবে এসআই দাবি করেন, বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়া জয়নাল খুবই বেপরোয়া প্রকৃতির তরুণ ছিল। তার বিরুদ্ধে দু-তিনটি মামলা রয়েছে বলে শুনেছি। সে শিক্ষার্থী কিনা জানা নেই।

২০১৮ সালের ৩ নভেম্বর বায়েজিদ থানার রৌফাবাদ পাহাড়িকা আবাসিক এলাকার শাহ আলমের বাসায় ঢুকে মারধর, হত্যাচেষ্টা ও চুরির ঘটনায় সাতজনের নামে মামলা হয়। বখাটে মো. জয়নালকে ২ নম্বর আসামি করা হয়।

তবে ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থী মো. জয়নালকে আটক করে বায়েজিদ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের সামনের মাঠে কথিত অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে যায় পুলিশ।

পরে বন্দুকযুদ্ধের পর একটি দেশীয় এলজি, কিরিচ ও চারটি কার্তুজের খোসা উদ্ধার করার তথ্য জানানো হয়। একই সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এসআই গোলাম মোহাম্মদ নাসিম হোসেন ও কনস্টেবল মাসুদ রানা আহত হন বলে দাবি করে পুলিশ। তারপর তদন্ত শেষে পুলিশ গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর আসামি বখাটে জয়নাল বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে উল্লেখ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।

একই বছরের ১৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট দাখিল করে কোর্ট পুলিশ। ওই দিনই শুনানির পর চার্জশিট আমলে নিয়ে মারা যাওয়া বখাটে আসামি জয়নালকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেন আদালত।

এরপর হঠাৎ চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি এ মামলার শুনানির দিন আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরা দাখিল করে বখাটে জয়নাল। মামলার বিচার কার্যক্রম এখন সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে।

নগরীর রৌফাবাদ পাহাড়িকা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মামলার বাদী শাহ আলম বলেন, মারধর, হত্যাচেষ্টা ও চুরির যে মামলা করেছি, সেই মামলার আসামি জয়নাল বেঁচে আছে। সে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়নি। তবে এ মামলার আসামি ভেবে পুলিশ অন্য জয়নালকে বন্দুকযুদ্ধে মেরে ফেলেছে বলে শুনেছি। পুলিশ চার্জশিটেও এ মামলার আসামি জয়নাল বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে বলে উল্লেখ করেছে। আসামি জয়নাল যেহেতু জীবিত, তাই তাকে চার্জশিটভুক্ত করতে গত ৩ সেপ্টেম্বর আদালতে আবেদন করেছি। আদালত ৬ অক্টোবর এ আবেদন শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

এদিকে বুধবার (৭ সেপ্টেম্বর) উচ্চ আদালতের নজরে আনার পর বিস্ময় প্রকাশ করেন উচ্চ আদালত। বিচারিক আদালত কি পদক্ষেপ নেয় সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়।

আর্কাইভ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ বিভাগের আরও খবর