রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:৫৫ অপরাহ্ন

বিরক্ত সেলিম ওসমান ছাড়লেন সভাপতির পদ : ফেরৎ দিলেন সংগৃহিত ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা

সোজা সাপটা রিপোর্ট : / ৭৯৭ জন পড়েছেন
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরো একটি নতুন ভবন নির্মাণের জন্য নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের প্রতি সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। গত ১৯ জুলাই সন্ধ্যা নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি এর সম্মেলন কক্ষে ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময় সভায় নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীরা সহ ব্যবসায়ী সংগঠন এবং ব্যক্তিগত তহবিল থেকে খানপুর হাসপাতালে একটি নতুন ভবন নির্মাণের জন্য তহবিল গঠন করা হয়েছিল।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া সহযোগীতার সেই অর্থ ৩১ আগস্ট সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টায় নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর সম্মেলন কক্ষে সংগৃহিত তহবিলের ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যবসায়ীদের কাছে ফেরত দিয়েছেন এমপি সেলিম ওসমান। যা কিনা একটি অনন্য দৃষ্টান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সমাজ।
করোনা শুরু হওয়ার পর ২৮ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এমপি সেলিম ওসমান খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালের উন্নয়ন এবং ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয়দের অস্থায়ী আবাসন, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা সহ বিভিন্ন খাতে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে প্রায় ৮৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা ব্যয় করেন। এ সময় উপস্থিত ব্যবসায়ীরা হাসপাতালের পেছনে ব্যয় হওয়া টাকাটা বাদ দিয়ে তাদের প্রদান করা সহযোগীতার অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন। কিন্তু এমপি সেলিম ওসমান এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে যে যত টাকা দিয়ে সহযোগীতা করেছেন তার পুরোটাই ফিরিয়ে দেন।
এ সময় এমপি সেলিম ওসমান সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, করোনার শুরুর দিকে আমাদের খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সহ বেশ কয়েকজন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। তখন ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক শামসুদ্দোহা সঞ্চয় একটি ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের সমস্যা গুলো বুঝাতে সক্ষম হয়ে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হতবাক হয়ে ছিলেন। সব কিছুর ব্যবস্থার করে দিয়ে ছিলেন। এরপর আমরা উপলব্দী করলাম করোনার বাইরে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার কোন ব্যবস্থা নাই। সে জন্য আমরা আপনাদের সহযোগীতা কামনা করি। হাসপাতালের ভেতরে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করে সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে। আমাদের ৫ কোটি টাকার মত ফান্ড সংগ্রহ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। ভবনটি নির্মাণের জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী বরাবর অনুমোদন চেয়ে আবেদন করে ছিলাম। আমি যতটুকু জানতে পেরেছি প্রধানমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জের চিকিৎসা ব্যবস্থার সামগ্রিক খোজ খবর নিয়েছেন এবং তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়েছেন। কেন কি কারনে নারায়ণগঞ্জের মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। তাই তিনি নিজেই বিষয়টি সরসারি নজর দিবেন এবং আগামী বছরের মধ্যেই খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালের চলমান উন্নয়ন কাজটি সম্পন্ন করবেন বলে জানতে পেরেছি। তাই তিনি সরকারী জায়গায় আপনাদের থেকে নেওয়া সহযোগীতার অর্থ দিয়ে ভবন নির্মাণের উদ্যোগটি স্থগিত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে আপনাদের এই টাকা আমার কাছে রাখা উচিত না। বর্তমানে ব্যবসার যে পরিস্থিতি আপনারা আপনাদের টাকা নিয়ে কাজে লাগান। আর আমি ব্যক্তিগত ভাবে ডাক্তার নার্স ওয়ার্ড বয়দের থাকা খাওয়া এবং ১ জুলাই থেকে রোগীদের খাওয়ার ব্যবস্থা সহ যে সেবা প্রদান করছি সেটি আমার পক্ষে ৩১ আগস্ট চালু ছিল যা আমরা ১৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক কে চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছিলাম। তবে তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার গৌতম রায়ের অনুরোধে আগামী আরো কিছুদিনের জন্য ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডবয়দের খাওয়ার ব্যবস্থাটা চালিয়ে যেতে আমি নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজকে অনুরোধ রাখছি।
সেই সাথে তিনি নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সভাপতি তানভীর আহম্মেদ টিটুর প্রতি অনুরোধ রেখে বলেন, করোনা মহামারির আপতকালীন সময় নারায়ণগঞ্জ ক্লাব হাসপাতালের ডাক্তারদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে মহৎ উদ্যোগ নিয়েছেন। এজন্য আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। যেহেতু সব কিছু স্বাভাবিক হচ্ছে। ক্লাবটি খুলে গেছে। আর যেহেতু এটি একটি লিমিটেড কোম্পানি তাই আমি আপনাদের কাছে অযৌক্তিক কোন দাবী রাখতে পারবোনা। তবে আমার অনুরোধ থাকবে আপনারা পরিচালনা পর্ষদের সাথে আলোচনা করে ডাক্তারদেরকে থাকার জন্য অন্যত্র কোন ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে সময় দেওয়া যায় কিনা বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
সেলিম ওসমান.এমপি আরো বলেন, খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে আগে অনেক অনিয়ম ছিল। যা বর্তমানে অনেকটাই কমে গেছে। কিন্তু কোন অবস্থাতেই আমি হাসপাতালের কর্মকর্তাদের দোষী করছিনা। কারন তারা যদি কোন কিছুর চাহিদাপত্র দেন তাহলে সেটা নারায়ণগঞ্জে আসতে এতো সময় লাগে যা চিন্তার বাইরে। আমি দীর্ঘদিন যাবত উক্ত হাসপাতালের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলাম। কিন্তু আজকের পর থেকে আমি আর সভাপতির দায়িত্বে থাকবোনা। কারন হাসপাতালে কখন কি লাগবে সেটা চেয়ে যদি পাওয়া না যায়, কখন কিভাবে টেন্ডার হচ্ছে কারা টেন্ডার দিচ্ছে সেটা যদি তত্ত্বাবধায়ক না বলতে পারেন আর সভাপতি সেই সকল বিষয় গুলো সম্পর্কে অবহিত না থাকেন তাহলে সেখানে আমার সভাপতি থাকার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করিনা। হাসপাতাল নির্মাণের পর থেকেই সিদ্দিকুর রহমান এখানে চাকরি করছেন। টাইপিস্ট থেকে তত্ত্বাবধায়কের সহকারী হয়েছে। আমরা জানতে পারলাম নারায়ণগঞ্জে তার অগাধ সম্পদ। আমি যখন তার বিরুদ্ধে তদন্ত দাবী করলাম তখন তাকে রাজশাহী বদলী করে দেওয়া হলো। এটা শাস্তি নাকি উপহার আমি জানি না। এখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই হাসপাতালটির বিষয়ে খোজ খবর রাখবেন। উনার সুদৃষ্টি এই হাসপাতালের উপর পড়েছে। উনিই ভাল বুঝবেন কিভাবে হাসপাতালটি পরিচালনা করতে হবে। আমরা নারায়ণগঞ্জের মানুষ প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা পাবো বলে আমি বিশ্বাস করি।
এছাড়াও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নারায়ণগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ডের সাবেক কমান্ডার ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট হোসনে আরা বেগম বাবলী, বাংলাদেশ ক্লথ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রবীর কুমার সাহা, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেড এর সভাপতি তানভীর আহম্মেদ টিটু তাদের বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জে একটি উন্নত মানের আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং নারায়ণগঞ্জের মাধ্যমিক স্কুল গুলোকে স্কুল এন্ড কলেজে রূপান্তরিত করা সহ একটি উন্নত মানের বিশ্ব বিদ্যালয় নির্মাণের জন্য জোরালো দাবী রাখেন। এ দুটি কাজ বাস্তবায়নে তারা নারায়ণগঞ্জের সকলকে একত্রিত হয়ে কাজ করে জনপ্রতিনিধিদের সহযোগীতা করার অনুরোধ করেন। প্রয়োজনে লাখো মানুষের গণস্বাক্ষর নিয়ে নারায়ণগঞ্জের মানুষের প্রাণের দাবীর কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
মত বিনিময় সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হোসিয়ারী অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি রাশেদ সারোয়ার, বিকেএমইএ এর পরিচালক মঞ্জুরুল হক, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিটন সাহা,নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর সিনিয়ির সহ সভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল, খানপুর ৩০০ শয্যা হাপসাতালের তত্ত্ববধায়ক গৌতম রায় সহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সহ শতাধিক ব্যবসায়ী।
দ্বিতীয় ধাপে গত ১৯ জুলাই সহযোগীতা প্রদান কারীদের মধ্যে শোভন গ্রুপের আবু আহম্মেদ সিদ্দিক ১০ লাখ, ফকির নীটওয়্যার এর ফকির আক্তারুজ্জামান ১০ লাখ, ফকির অ্যাপারেলস এর ফকির মনিরুজ্জামান ১০ লাখ, টার্গেট গ্রুপের তানভীর আহম্মেদ টিটু ১০ লাখ, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এর সাবেক সহ সভাপতি রাশেদ সারোয়ার ৫ লাখ, মডেল গ্রুপের মাসুদুজ্জামান ৫ লাখ, এসপি গার্মেন্টস এর সুবল চন্দ্র সাহা ৫ লাখ, হাজী হাসেম স্পিনিং এর মোহাম্মদ সোলায়মান ৫ লাখ, বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্টের সভাপতি লিটন সাহা ৫ লাখ, আলীরটেক ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জাকির হোসেন ৫ লাখ, নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সহ সভাপতি আমিনুর রশিদ ৫ লাখ, বিকেএমইএ এর পরিচালক রতন সাহা ৫ লাখ, নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সিনিয়র সহ সভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল ৫ লাখ, বিকেএমইএ এর পরিচালক শাহাদাৎ হোসেন ভূইয়া সাজনু ৫ লাখ, বিকেএমইএ এর পরিচালক কবির হোসেন ২ লাখ, বিকেএমইএ এর পরিচালক নন্দ দুলাল সাহা ৩ লাখ, বিকেএমইএ এর পরিচালক নাসিম উল তারেক মঈন ৩ লাখ, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব এর পরিচালক ইদি আমিন ইব্রাহিম খলিল ১ লাখ, বিকেএমইএ এর পরিচালক আশিকুর রহমান ৩ লাখ, আলীরটেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান ৫ লাখ, মোহাম্মদ হাতেম ৫ লাখ, দীপক কুমার সাহা ৫ লাখ, জসিম উদ্দিন ২ লাখ টাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মহসিন মিয়া ১ লাখ টাকা সহ ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা ফেরত প্রদান করা হয়েছে।
এর আগে হাসপাতালটির উন্নয়নে মে মাসে প্রথম ধাপে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উইজডম অ্যাটায়ার্স লিমিটেড এর পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমপি সেলিম ওসমান ২০ লাখ টাকা, নির্বাহী পরিচালক ও থ্রিস্টার ফার্ম হাউজ এর স্বত্তাধিকারী মিসেস নাসরিন ওসমান ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মডেল ডি ক্যাপিটেল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২৫ লাখ টাকা, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, বিকেএমইএ সহ সভাপতি(অর্থ) মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল, পরিচালক আশিকুর রহমান, সাইফুল খন্দকার, কবির হোসেন, নন্দ দুলাল সাহা, শাহাদাৎ হোসেন ভূইয়া সাজনু, সেলিম মাহাবুব, ইমরান কাদির তূর্য, নাসিমুল তারেক মঈন সম্মিলিত ভাবে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মেট্রো নিটিং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমল পোদ্দার ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ড্রিম হলিডে অ্যাডভ্যাঞ্চার পার্কের স্বত্তাধিকারী প্রবীর কুমার সাহা ১০ লাখ টাকা, আটা ময়দা মিলক মালিকদের মধ্যে মতিউর রহমান মতি, জসিম উদ্দিন মৃধা, দেলোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ সোহাগ, আব্দুর রশিদ ও মোহাম্মদ ইব্রাহিম সম্মিলিত ভাবে ৬ লাখ টাকা সহ ১ কোটি ১০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।

আর্কাইভ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ বিভাগের আরও খবর