রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:৩০ অপরাহ্ন

সৌদি রীতিতে সাজা দিতেই স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা করে শারমিন

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : / ৮৩০ জন পড়েছেন
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২০

স্বামী পরকীয়ায় আসক্ত এই সন্দেহ থেকেই ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে স্বামী জামাল হোসেনকে হত্যার পরিকল্পনা করে শারমিন আক্তার। পরকীয়া মানে হচ্ছে অবৈধ সম্পর্কের মাধ্যমে কোন নারীকে ধর্ষণ করা। আর সৌদি আরবে কোন নারীকে ধর্ষণের সাজা হচ্ছে মৃত্যুদন্ড। জামাল হোসেন যেহেতু দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন তাই তাকে এই সাজা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শারমিন। সৌদি আরবের রীতি অনুযায়ী শারমিন স্বামীর মৃত্যুদন্ড কার্যকরের জন্য ছেলে ও মেয়ের সহায়তা নেন।
গত মঙ্গলবার গভীররাতে ফতুল্লার দাপা ইদ্রাকপুরের নিজ বাড়িতে স্ত্রী ও সন্তানদের হাতে খুন হন প্রবাসী জামাল হোসেন। দেড় বছর আগে দেশে এসে আর সৌদি আরবে ফিরে যাননি তিনি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রবাসী জামাল হোসেনকে হত্যার দায় স্বীকার করে তার স্ত্রী ও ২ সন্তান পৃথক দুই ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি প্রদান করে। শারমিন নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফতাবুজ্জামনের আদালতে এবং তার দুই সন্তান সামিয়া আক্তার ও তানভীর হোসেন ডালিম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাউসার আলমের আদালতে পৃথক ভাবে জবানবন্দি প্রদান করে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) আসাদুজ্জামান।
নিহত জামাল হোসেনের ঘাতক স্ত্রী ও তার দুই সন্তানের জবানবন্দির উদ্বৃতি দিয়ে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেন বলেন, জামাল হোসেন ও তার স্ত্রী শারমিন আক্তার একে অপরকে সন্দেহ করতেন। শারমিনের অভিযোগ তার স্বামী জামাল পাশের ইরান বাড়ি এলাকার এক নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত। এনিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। ঘটনার দিন সকালেও উভয়ের মধ্যে প্রচন্ড ঝগড়া হয়। এরপর দুপুরেই মেয়ে সামিয়াকে স্বামীর বাড়ি থেকে ডেকে এনে ছেলে ডালিমকে সঙ্গে নিয়ে জামাল হোসেনকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
যেভাবে হত্যাকান্ড
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে শারমিন জানায়, অপর নারীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সন্দেহ থেকে স্বামীকে সৌদি রীতি অনুযায়ী শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেয় সে। যেহেতু সৌদি আরবে এসব অপরাধের সাজা মৃত্যুদন্ড তাই শারমিন স্বামীকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। গত মঙ্গলবার সকালে স্বামী জামাল হোসেনের সঙ্গে ঝগড়ার পর জামাল বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। দুপুরে বাসায় ফিরে জামাল গোসল করে। এতে শারমিনের সন্দেহ আরও জোরালো হয়। দুপুরেই সে মেয়ে সামিয়াকে শ^শুর বাড়ি থেকে ডেকে আনে। বিকেলে শারমিন ছেলে ও মেয়ের কাছে জামালকে হত্যার পরিকল্পনা জানায়। ওই সময় ছেলে মেয়ে একাজে তাকে সহায়তা না করার কথা বললেও শারমিন তার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় পরে তারা রাজি হয়। রাতে জামালসহ তারা সবাই একসঙ্গে ভাত খায়। রাতে দুধ খাওয়ার অভ্যাস থাকায় জামালের দুধের সঙ্গে ২ পদের ১৬টি ঘুমের ওষুধ মেশায় শারমিন। দুধ খাওয়ার পর বাসার ড্রয়িং রুমে সোফায় ঘুমিয়ে পড়ে সে। রাত ১ টায় কিলিং মিশন শুরু করে শারমিন ও তার ছেলে মেয়ে। প্রথমে শারমিন নিজের ওড়না দিয়ে জামালের দু’পা বেঁধে ফেলে। এরপর সে নিজেই জামালের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে দু’টি আঘাত করে। ওই সময় সামিয়া ও ডালিম পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মাথায় হাতুড়ির আঘাতে জামাল জেগে উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করলে ওই সময় শারমিন ছেলে মেয়েকে জামালকে জাপটে ধরার নির্দেশ দেয়। ওই সময় ডালিম ও সামিয়া বাবার দু’হাত চেপে ধরে এবং শারমিন হাতুড়ি দিয়ে জামালের মাথায় বেশ কয়েকটি আঘাত করে। এতে সে রক্তাক্ত হয়ে নিথর হয়ে পড়ে। পরে ছেলে মেয়ের সহায়তায় শারমিন জামালের নিথর দেহ বাথরুমে নিয়ে ফেলে রাখে এবং ঘটনা অন্যদিকে প্রবাহিত করতে বাথরুমের হাইকমোড হাতুড়ি দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে। যাতে বোঝানো যায় জামাল বাথরুমে পড়ে গিয়ে কমোডের সঙ্গে মাথা ঠুকে মারা গেছে।
এরপর রাত আড়াইটায় জামালের ছেলে ডালিম তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার ভাড়াটেদের ডেকে আনে। ভাড়াটেরা এসে জামালের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে। ওই সময় ডালিম অ্যাম্বলেন্স আনার কথা জানালে ভাড়াটেদের কয়েকজন জামালকে পরীক্ষা করে তাদের জানায় জামাল মারা গেছে। এরপর বুধবার সকালে বাসার ছাড়ে নিজেরাই জামালের লাশ গোসল করায় শারমিন ও তার ছেলে মেয়ে। কিন্তু বাদ সাধে জামালের ভাতিজা জাহিদুল ইসলামসহ প্রতিবেশিরা। তারা জামালের মাথা থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে দেখতে পেয়ে পুলিশকে ঘটনাটি জানায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে।
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেন বলেন, জামালকে হত্যার কথা তার স্ত্রী ও ছেলে মেয়েরা স্বীকার করেছে। হত্যায় ব্যবহৃত হাতুড়ি এবং ওড়না জব্দ করা হয়েছে।

আর্কাইভ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ বিভাগের আরও খবর