শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:২১ পূর্বাহ্ন

ব্যবসায়ি আনোয়ার হত্যা মামলায় প্রশ্নবিদ্ধ পুলিশের তদন্ত!

বিশেষ প্রতিবেদক: / ৯৯ জন পড়েছেন
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না নারায়ণগঞ্জ পুুলিশকে। গণধর্ষণ ও হত্যার পর নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার ১ মাস ২০ দিন পর এক কিশোরীর জীবিত ফিরে আসা এবং ওই ঘটনার দায় স্বীকার করে তিন আসামীর আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দী কারণে নারায়ণগঞ্জ পুলিশকে নিয়ে সমালোচনা এখন সারা দেশে। এনিয়ে উচ্চ আদালতে রিভিশন মামলাও দায়ের হয়েছে। এঘটনার মধ্যেই রূপগঞ্জের আনোয়ার হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে জেলা পুলিশ। নিহত আনোয়ারের স্ত্রী সাথী বেগমের অভিযোগ, তার স্বামী আনোয়ার হত্যায় ৯ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছিলেন তিনি। কিন্তু পুলিশ আসামীদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে ৯ জনের মধ্যে মাত্র এক আসামীকে গ্রেফতার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী নিয়ে বাকি আসামীদের চার্জশীটের বাইরে রেখেছেন। শুধু তাই নয় বাকী ৮ আসামীকে গ্রেপ্তারেরও প্রয়োজন মনে করেনি পুলিশ। পুলিশের দায়সারা তদন্তের সুযোগ নিয়ে বাকি আসামীরা এখন তাকে ও তার তিন সন্তানকেও হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। এতে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
গত ৬ মে দুপুরে রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রের ভাড়া বাসায় স্ত্রী সাথী বেগমের সামনেই পূর্ব দ্বন্দ্বের জেরে ৯ জন প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে আনোয়ার হোসেনকে।
নিহত আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী সাথী বেগমের অভিযোগ, তার সামনেই গত ৬ মে দুপুরে তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী হিসেবে ৯ জনকে আসামী করে রূপগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ আসামীদের মধ্যে একজনকে গ্রেফতার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী নিয়ে বাকি ৮জন আসামীকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে চার্জশীট জমা দিয়েছে। তিনি চার্জশীটের বিরুদ্ধে গত ২০ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে নারাজি দেন। কিন্তু আদালত নারাজি না মঞ্জুর করে পুলিশের চার্জশীট গ্রহণ করে। ওই আদেশে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি ওই আদেশ বাতিলের জন্য গত ২৬ আগস্ট জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে ফৌজদারি রিভিশন দাখিল করেন। আদালত সেটি গ্রহণ করেছে। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে শুনানী ও আদেশের দিন ধার্য রয়েছে।
সাথী বেগমের অভিযোগ, যেখানে আমার স্বামী আনোয়ারের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তে উল্লেখ রয়েছে, তার শরীরের নানা জায়গায় ১২টি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। সেখানে পুলিশ ৯ আসামীর মধ্যে আসামী ওয়াজিউল্লাহ’র জবানবন্দী অনুযায়ী দুই জায়গায় আঘাতের কথা আমলে নিয়ে তাকেই একমাত্র আসামী করে বাকিদের চার্জশীট থেকে বাদ দিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আসে নিহতের শরীরে বাকি ১০টি আঘাতের চিহ্ন কোথা থেকে এলো? চার্জশীট থেকে অব্যাহতি পেয়ে বাকি আসামীরা এখন আমাকে আমার সন্তানদেরসহ হত্যার হুমকি দিতে পারছে।
সাথী বেগমের ভাষ্যমতে, তার স্বামী আনোয়ার হোসেনের রড,সিমেন্ট, ইট, বালু বিক্রির ব্যবসা ছিল। ব্যবসায়ির দ্বন্দ্বের জেরে গত ৬ মে দুপুরে নাসির উদ্দিন, সালাউদ্দিন ওরফে সালু, মো.ওয়াজিউল্লাহ, শাহিন খান, সাইফুল ইসলাম, স্বপন, মোখলেছ, শাহআলম, রাজিব ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাদের ভাড়া বাসায় এসে আনোয়ারকে বাসা থেকে ডেকে বাইরে বের করে। বাইরে নিয়েই আসামীরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। তাকে গুরুতর আহতবস্থায় রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। হাসপাতালে নেয়ার পথেই আনোয়ার মারা যায়।
এদিকে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত আনোয়ার হোসেনের মাথার তালুতে কাটা রক্তাক্ত জখম, বাম গালে কাটা রক্তাক্ত জখম, গলার ডান পাশে কাটা রক্তাক্ত জখম, বাম পাশে কাটা জখম, পেট এর ডানপাশে কাটা রক্তাক্ত জখম, তল পেট কাটা অল্প নাড়ি ভুড়ি বের হওয়া, তলপেটের নিচে কাটা জখম, ঘাড়ের বাম পাশে কাটা রক্তাক্ত জখম, বাম হাতের কনুইয়ের উপরে বড় ক্ষত এবং পিছনে কোপের দাগ আছে। ডান হাতের মাসলে কাটা দাগ আছে এবং কনুইয়ে ছোলা দাগ আছে।
নিহত আনোয়ার হোসেনের ময়না তদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ীও তার দেহের নানা জায়গায় জখমের চিহ্নের কথা উল্লেখ আছে। আনোয়ার হোসেনের ডান ফুসফসে, যকৃত, উদরের উপরের ঝিল্লী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও এরআশেপাশে গুরুতর জখম হয়েছে বলা হয়। এছাড়া মাথায়, কিডনীসহ অন্যান্য জায়গাতেও জখমের কথা উল্লেখ করা হয়।
মামলার স্বাক্ষী ও বাদী নিহতের স্ত্রী সাথী বেগম দাবি করেন, এজহারে যেই ৯জনের নাম দিয়েছেন তাদের ব্যাপারে সঠিকভাবে তদন্ত না করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রূপগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) এইচএম জসিম উদ্দিন চার্জশীট দিয়ে দিয়েছেন। চার্জশীটের একমাত্র আসামী হিসেবে মামলার ৩নং আসামী মো.ওয়ালী উল্লাহ ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীতে আদালতে বলেন, ঘটনার দিন জোহরের নামাজের আগ মুহুর্তে আনোয়ার তাকে চড় মারে। আনোয়ারই তাকে খবর দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তখন ওয়ালীউল্লাহর হাতে চাকু ছিল। আনোয়ার চড় মারার পড় ওয়ালী উল্লাহ চাকু দিয়ে তাকে আঘাত করে। প্রথমে কাধে পাড় মারেন এবং পরে পেটে পাড় মারেন। এরপর তিনি বাসায় চলে যান। ওয়ালীউল্লাহ তার জবানবন্দীতে বলেন, তিনি যখন আনোয়ারকে চাকু দিয়ে জখম করেন তখন সেখানে অন্য কেউ ছিলো না।
এ বিষয়ে বাদির আইনজীবী অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু বলেন, ‘আমার মক্কেলের কথা অনুযায়ী পুলিশ এই মামলার অন্যান্য আসামীদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে শুধু ওয়াজিউল্লাহ’র ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ভিত্তিতে যে চার্জশীট দাখিল করেছেন এটি সঠিক নয়। পুলিশ যদি এজহারের অন্যান্য আসামীদের গ্রেফতার করে তদন্ত করত তাহলে অন্যান্য আসামীদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যেত এবং তারা চার্জশীটে যুক্ত হতো। যার কারণে মামলার বাদি বিধি মোতাবেক বিজ্ঞ নিম্ন আদালতে দাখিলকৃত চার্জশীটের বিরুদ্ধে আপত্তি দাখিল করে। কিন্তু বিজ্ঞ নিম্ন আদালত বাদিনীর আপত্তি বিবেচনায় না নিয়ে পুলিশের দাখিলকৃত চার্জশীট গ্রহণ করে এবং বাদিনীর নারাজি নামঞ্জুর করে দেয়। আমি বাদিনীর পক্ষে বিজ্ঞ নিম্ন আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ফৌজদারি রিভিশন দাখিল করেছি। আদালত শুনানি শেষে সেটি গ্রহণ করে। আমি বিশ্বাস করি আমরা ন্যায় বিচার পাবো। কেননা আইনের বিধান হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ অথবা এজহারকারী পুলিশ রিপোর্টে অসন্তুষ্ট হয়ে যদি নারাজি দেন সেক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালত নারাজি গ্রহণ করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য অন্য যে কোন সংস্থার উপর দায়িত্ব অর্পণ করেন। এটিই বিধান। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতে অসংখ্য নজির রয়েছে। এক্ষেত্রে সেটির ব্যত্যয় ঘটেছে।
অভিযোগের বিষয়ে রূপগঞ্জ থানার ওসি মাহামুদুল হাসান বলেন, বাদি যাদের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করুক না কেন তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব হচ্ছে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করা। পুলিশ সেই কাজটিই করেছে। তাছাড়া বাকী ৮ জনে ফোনের কললিস্ট খতিয়ে পুলিশ দেখতে পেয়েছে যে, ঘটনার দিন ওই ৮ জন ঘটনাস্থলের আশপাশেই ছিলেন না। তাহলে তাদের কিভাবে চার্জশীট ভুক্ত করা যায়। তাছাড়া একটি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ার আগে শুধু ওসি নয়, জেলা পুলিশের বেশ কয়েকজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তার ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। তবে বাদি যদি পুলিশের অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট না হন সেক্ষেত্রে আদালতে নারাজি পিটিশন দিতে পারেন। আদালত প্রয়োজন মনে করলে অন্য যে কোন সংস্থাকে দিয়ে পুনঃতদন্ত করতে নির্দেশ দিতে পারেন।

আর্কাইভ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ বিভাগের আরও খবর