শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:৩২ অপরাহ্ন

বেরিয়ে আসছে ‘জালাল মামা’র থলের বেড়াল

বিশেষ প্রতিবেদক: / ৯৬৭ জন পড়েছেন
সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২০

১৯৫০ সালে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলো খাদ্য গুদাম সংলগ্ন আমতলায় সোনা মিয়ার পুরোনো বাড়িতে জালাল উদ্দিনের জন্ম। মরহুম সোনা মিয়ার ৬ মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে জালাল উদ্দিন তৃতীয়। যিনি এখন জালাল মামা হিসেবে পরিচিত সবার কাছে। আদমজী ঘিরে মরহুম সোনা মিয়ার সুনাম এখনো বিদ্ধমান থাকলেও সেই সুনাম নস্ট করে দিচ্ছে জালাল মামা। কারণ অবৈধ টাকার নেশা তাকে অন্ধ করে দিয়েছে। কে চোর, কে মাদক ব্যবসায়ি, কে পরিবহন চাঁদাবাজ, কে বালু সন্ত্রাসী, কে তেল চোর- এতে কিছু যায় আসে না। শুধু জালাল মামার নেক নজরে থাকলেই হলো। বিনিময়ে জালাল মামা নিয়মিত নানাভাবে সুবিধা নেন তাদের কাছ থেকে। করোনার এই পরিস্থিতিতে ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের গৃহবধূর দেয়া ত্রাণ সামগ্রী পরিবহন সেক্টরের এক চিহ্নিত চাঁদাবাজকে দিয়ে বিতরণ করিয়ে নানা বির্তকের সৃষ্টি করেছেন এই জালাল মামা। অথচ ওই পরিবারের অনেক শুভাকাংখি ও রাজনৈতিক নেতা ছিল, যাদের মাধ্যমে বিতরণ করাতে পারতেন। তাছাড়া বিত্তশালী মামা নিজেও তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এমন তথ্য সিদ্ধিরগঞ্জবাসীর কাছে নেই। যেখানে লাভ আছে, স্বার্থ আছে সেখানেই মামা। অবৈধ সুবিধা নিতে কখনো এই নেতাকে আবার কখনো ওই নেতাকে পর্দার আড়াল থেকে সমর্থন যোগান তিনি। যার কাছ থেকে বেশি সুবিধা পান তাকে নানাভাবে হাইলাইট করার চেষ্টা করেন। সিদ্ধিরগঞ্জের সব কিছুতেই মামার একটা তাবেদারী থাকবেই। এমপির অনুসারী নেতাকর্মীরা তাকে খুশি রেখেই চলতে হয়। কারণ মামা যদি ঘোষ্যা করেন তাহলে এমপির বিরাগভাজন হওয়ার ভয় থেকেই নেতাকর্মীরা জালাল মামাকে সমীহ করেন। এবং তাকে ম্যানেজ করেই রাজনীতি করছেন। এ নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও প্রকাশ্যে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করছেন। কথায় আছে ‘বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে’?
সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জালাল মামা নিজেকে এমনভাবে তৈরী করেছেন যেন দলমত নির্বিশেষে সবাই তার দ্বারস্থ হয়। যে তার দারস্থ হবে তার কাজ করতে বা ব্যবসা করতে সমস্যা নেই। আর যে মামার দ্বারস্থ হবে না তার কাজ বা ব্যবসায় নানা ধরণের ঝামেলা পোহাতে হয়। রীতিমত নিজস্ব এক বলয় তৈরী করে নিয়েছেন তিনি। বালু, পরিবহন, জমি বিক্রি, টেন্ডার, তদবির-বাণিজ্য, জ¦ালানী তেল চুরি সব কিছু থেকেই মামার হিস্যা (ভাগ) থাকা চাই। সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল টেকপাড়াস্থ জেএমএস গ্লাস ফ্যাক্টরীর ভেতর তার ব্যক্তিগত অফিসেই চলে সব ধরণের দেনদরবার।
সূত্র জানায়, নাম মাত্র দরপত্রের মাধ্যমে বিটু নামে বিএনপি’র এক সমর্থক কাঁচপুর ল্যান্ডিং স্টেশন ভোগ করে আসছে। কারণ নেপথ্যে জালাল মামা। আর জালাল মামার কারণে কেউ সিডিউল কিনতে সাহস পায়নি কেউই। ফলে ২০১৫ সাল থেকে বিএনপির বিটু জালাল মামাকে নিয়মিত ভাগ দিয়ে ল্যান্ডিং স্টেশন পরিচালনা করে আসছে। এছাড়া ল্যান্ডিং স্টেশনে ২৫ থেকে ৩০ জন লোক কাজ করে। সব বিএনপির। সেখানে আওয়ামীলীগের কোন লোকজনের কাজ করার সুযোগ নেই। বা চান্স পায় না।
এদিকে চুন শিল্প থেকে সুবিধা নিতে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিনের অত্যন্ত ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত বিএনপির আব্দুল হাই মেম্বারকে ২০১৭ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে আওয়ামীলীগে যোগদান করায় জালাল মামা। শিমরাইল ট্রাক টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ করছে মাদক ব্যবসায়ি ও পরিবহন চাঁদাবাজ দেলোয়ার। তাকে সরাসরি শেল্টার দিচ্ছে জালাল মামা। ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নুর হোসেন থাকতে এই ট্রাকটার্মিনাল নুর হোসেন নিজে নিয়ন্ত্রণ করতো। নুর হোসেনের পতনের পর তার বাহিনীর দাগী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ি এখন জালাল মামার শেল্টারে। নুর হোসেনের অবৈধ আয়ের বড় অংশও জালাল মামার দখলে।
মাদক ব্যবসায়ি ও পরিবহন চাঁদাবাজ ভাগিনা দেলোয়ার ও নুর হোসনের ছোট ভাই বালু সন্ত্রাসী জজ মিয়াকে সরাসরি শেল্টার দিচ্ছেন জালাল মামা। বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে ভালো সুবিধা নিচ্ছেন প্রতি মাসে। নুর হোসেনের ম্যাসেজে তার ভাই মিয়া মোহাম্মদ নুরু উদ্দিনকে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করিয়ে এখন আওয়ামীলীগে ভেড়ানোর মিশনের রয়েছেন জালাল মামা। নুরুদ্দিনকেও তিনি ছায়া দিচ্ছেন।
৬নং ওয়ার্ডের দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, জালাল মামার কারণেই আজ নাসিক ৬নং ওয়ার্ডের পরিবেশ অশান্ত। এমপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বর্তমান কাউন্সিলর মতি এলাকা ছাড়া। এই ওয়ার্ডটিকে মামা নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রন করতে চান। কিন্তু এই ওয়ার্ডের নেতাকর্মীদের কথা হলো আমরা মাননীয় সংসদ সদস্যের রাজনীতি করি। কোন মামার রাজনীতি করি না। এই কথাই কাল হয়েছে তাদের জন্য। ফলে মতিকে শায়েস্তা করতে সিরাজ মন্ডলকে শেল্টার দেয় মামা। এবং অন্ধভাবে সিরাজ মন্ডলকে সাপোর্ট দিতে থাকে। ফলে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে ওঠে সিরাজমন্ডল ও তার বাহিনীর সদস্যরা। বলাবলি আছে, সিরাজ মন্ডলের সাথে একাধিক ব্যবসায় জড়িয়েছেন মামা। সেই ব্যবসা ঠিক রাখতে সিরাজ মন্ডলকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জালাল মামা।
ওদিকে রোববার (৯ আগস্ট) একাধিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে জালাল মামাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তোলপাড় শুরু হয় সিদ্ধিরগঞ্জসহ সর্বত্র। দুপুরের মধ্যেই শিমরাইল মোড়ের বিভিন্ন স্টলে পত্রিকারগুলোর সব কপি বিক্রি হয়ে যায়। পত্রিকা অফিসে অসংখ্য মানুষ নাম পরিচয় গোপন রেখে সাধুবাদ জানান। এমন সংবাদ প্রকাশ করার কারণে। তারা বলেন, দুই যুগের বেশী সময় ধরে এই জালাল মামা এমপির আত্মীয়তার সুবাধে নিজের খেয়াল খুশিমত যা ইচ্ছে করে যাচ্ছেন। একটা মানুষের কত টাকার প্রয়োজন? আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরাও তাকে বখরা দিতে হয়। সব কাজের মধ্যেই তার ভাগ চাই। এভাবে হলে চলবে কিভাবে? তার কি কোন অবদান আছে আওয়ামলীগের জন্য? তিনি কি আওয়ামীলীগের রাজনীতি করেন? অথচ ভাবটা এমন তিনি আওয়ামীলীগের অনেক বড় নেতা। তার কারণে একদিন আওয়ামীলীগের বারোটা বাজবে সিদ্ধিরগঞ্জে। কারণ যেভাবে অবৈধ সুবিধার জন্য বিএনপির লোকজনকে সুযোগ করে দিচ্ছেন তিনি তাতে বিএনপির লোকজন সুবিধাজনকভাবেই মামার কল্যানে ব্যবসা-বাণিজ্য করে যাচ্ছে। অথচ আওয়ামীলীগের বহু ত্যাগী নেতাকর্মীরা অর্থকস্টে রয়েছে।
অপরদিকে রোববার সন্ধ্যায় সিদ্ধিরগঞ্জ মুজিব মার্কেট ও মিজমিজি টিসি রোড এলাকায় অনেককেই জালাল মামাকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে আলোচনা করছেন। তারা বলাবলি করেন, মজিবর সাবরা অনেক খুশি। এতোদিন পর জালাল মামার সব ফাঁস করে দিছে সাংবাদিকরা। তাছাড়া জালাল মামাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর সিদ্ধিরগঞ্জে আওয়ামীলীগ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছাস দেখা গেছে। তারা পত্রিকা কিনে এনে পড়ার পর অনেকেই তা সংরক্ষন করছেন। তাদের বক্তব্য এই পত্রিকা একদিন কাজে আসবে। ভবিষ্যতে আওয়ামীলীগের ভরাডুবি হলে সেদিন এই পত্রিকা দেখিয়ে বলা যাবে কার কারণে সিদ্ধিরগঞ্জে আওয়ামীলীগের বারোটা বাজছে।
তবে জালাল মামা তার সিন্ডিকেটের সদস্য কয়েকজন আওয়ামীলীগ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীকে মাঠে নামিয়েছে। তার পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য। তারা বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ পাঠিয়ে মামার গুণকির্তন করছে। না হলে তো তাদের আয় বন্ধ করে দিবে “মামা’। তাই তারা সাফাই গাইতে বিভিন্ন স্থানে দৌড় ঝাপ করছে। কিন্তু মনে মনে খুশি। মামার কুর্কীতি তো প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিবাদ করে কি আর সব ঢেকে রাখা যাবে?
একটি সূত্র জানায়, জালাল উদ্দিনের এমন কর্মকান্ড পরিবারের সদস্যরাও ভালো চোখে নিচ্ছেন না । তাদের মতে, আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, বাবার পরিচিতি সব মিলিয়ে ভালোই তো চলছে। কিন্তু সে (জালাল উদ্দিন) কেন এই সবের মধ্যে যায়?

আর্কাইভ


আপনার মতামত লিখুন :

One response to “বেরিয়ে আসছে ‘জালাল মামা’র থলের বেড়াল”

  1. Anonymous says:

    ❤❤❤❤

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ বিভাগের আরও খবর